থার্মোমিটার বিবর্তনের রোমাঞ্চকর ইতিহাস
· Prothom Alo

শরীরের তাপমাত্রা একটু বেশি হলেই আমরা থার্মোমিটার ব্যবহার করে থাকি। কেউ আবার ঘরের তাপমাত্রা জানতে নিয়মিত থার্মোমিটার ব্যবহার করেন। আর তাই আকারে ছোট এই যন্ত্র ধীরে ধীরে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীর আগে মানুষের কাছে তাপ পরিমাপ করার কোনো যন্ত্র ছিল না। গরম বা ঠান্ডা ছিল কেবল একটি অনুভূতি। এই অনুভূতিকে একটি স্কেলে বন্দী করার যাত্রাটি শুরু হয়েছিল বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির হাত ধরে।
Visit freshyourfeel.org for more information.
ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে ও সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানের বিপ্লব যখন তুঙ্গে, তখন গ্যালিলিও গ্যালিলি তাপ মাপার জন্য একটি যন্ত্র তৈরি করেন। সেই যন্ত্রের নাম ছিল থার্মোস্কোপ। কাচের নলযুক্ত থার্মোস্কোপের মাথায় একটি বাল্ব বা গোলক এবং নিচের দিকটি খোলা অবস্থায় একটি তরল পানির পাত্রে ডোবানো থাকত। বাল্বের ভেতরের বাতাস গরম হলে প্রসারিত হতো এবং নলের ভেতর জলের উচ্চতা নিচে নামিয়ে দিত। তবে এর কোনো নির্দিষ্ট স্কেল বা দাগ ছিল না। তাই এটি কেবল তাপের পরিবর্তন বোঝাতে পারত, নির্দিষ্ট মাত্রা নয়।
১৬১২ সালের দিকে ভেনিসীয় পণ্ডিত সান্তোরিও সান্তোরিও থার্মোস্কোপে প্রথম স্কেল যোগ করেন। তিনিই প্রথম এই যন্ত্রটিকে চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করেন। রোগীকে নলের বাল্বটি হাত দিয়ে ধরে থাকতে হতো বা তাতে নিশ্বাস ফেলতে হতো যেন তাপমাত্রা বোঝা যায়। তিনি স্কেলের সর্বনিম্ন বিন্দু নির্ধারণ করেছিলেন গলিত তুষার দিয়ে এবং সর্বোচ্চ বিন্দু মোমবাতির শিখা দিয়ে।
পুরোনো দিনের থার্মোমিটার১৬৫০–এর দশকে টাস্কানির গ্র্যান্ড ডিউক ফার্দিনান্দো দ্বিতীয় ডি’মেডিচি থার্মোমিটারের নকশায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তিনিই প্রথম বাতাস থেকে বিচ্ছিন্ন বা সিল করা থার্মোমিটার তৈরি করেন। এটি বায়ুমণ্ডলের চাপের পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। এই যন্ত্রে পানির বদলে পাতিত ওয়াইন ব্যবহার করা হতো। এগুলো ফ্লোরেন্টাইন থার্মোমিটার নামে পরিচিতি পায়।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগেও তাপমাত্রা মাপার কোনো স্বীকৃত মানদণ্ড ছিল না। একেকজন বিজ্ঞানী একেক পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। কেউ মাখনের গলনাঙ্ক, কেউ প্রাণীর শরীরের তাপমাত্রা, আবার কেউ প্যারিস অবজারভেটরির ভূগর্ভস্থ কক্ষের তাপমাত্রাকে মানদণ্ড ধরতেন। এই বিশৃঙ্খলা দূর করার প্রথম পদক্ষেপ নেন ড্যানিশ জ্যোতির্বিদ ওলাস রেমার। ১৭০১ সালে তিনি জলের হিমাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ককে ভিত্তি হিসেবে ধরার প্রস্তাব করেন।
থার্মোমিটারের ইতিহাসে সবচেয়ে পরিচিত নাম ড্যানিয়েল গ্যাব্রিয়েল ফারেনহাইট। তাঁর জীবন ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে তাঁর মা–বাবা মারা যান। এরপর তিনি ব্যবসায়ী হওয়ার বদলে বিজ্ঞানের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং ঋণের দায়ে দেশত্যাগ করে ১২ বছর যাযাবরের মতো কাটান। ফারেনহাইট রেমারের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর স্কেলটিকে আরও উন্নত করেন। তিনি তরল হিসেবে পানির বদলে পারদ ব্যবহার শুরু করেন। তা আরও নির্ভুল ফলাফল দিতে সক্ষম ছিল। তিনি বরফ, পানি ও লবণের মিশ্রণকে শূন্য ডিগ্রি ধরে তাঁর স্কেল তৈরি করেন। ফারেনহাইট স্কেলে পানির হিমাঙ্ক ৩২ ডিগ্রি এবং মানুষের শরীরের তাপমাত্রা ৯৬ ডিগ্রি ধরা হয়েছিল।
ফারেনহাইটের সাফল্যের পর ১৭৪২ সালে সুইডিশ জ্যোতির্বিদ আন্দ্রেস সেলসিয়াস ১০০ ডিগ্রির একটি স্কেল প্রবর্তন করেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, তাঁর মূল স্কেলে ১০০ ডিগ্রি ছিল হিমাঙ্ক ও শূন্য ডিগ্রি ছিল স্ফুটনাঙ্ক! পরবর্তী সময় ফরাসি পদার্থবিদ জঁ–পিয়েরে ক্রিস্টিন এই স্কেলটিকে উল্টে দেন এবং বর্তমানের পরিচিত রূপ দান করেন, যেখানে শূন্য ডিগ্রি হলো হিমাঙ্ক ও ১০০ ডিগ্রি হলো স্ফুটনাঙ্ক। এভাবেই তৈরি হয় আধুনিক থার্মোমিটার।
সূত্র: টাইম